দুলাল সরকার : নরসিংদীর বেলাব উপজেলার সলল্লাবাদ ইউনিয়নের ইব্রাহীমপুর গ্রামের হালগড়ার মাঠ ও কিশোরগঞ্জ জেলার কুলিয়ারচর উপজেলার ভৈরব শুম্ভপুরের মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ। এ নদের উপর একটি সেতুর দাবিতে দুই জেলার মানুষ যুগের পর যুগ অপেক্ষা করলেও সেই স্বপ্ন আজও পূরণ হয়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের একাধিকবার প্রতিশ্রুতির পরও ১৫ বছরে সেতু নির্মাণ বাস্তবায়ন হয়নি।
স্থানীয়রা জানান, প্রতিদিন দুই পারের প্রায় দুই থেকে তিন হাজার মানুষকে নৌকায় ভর করে নদী পার হতে হয়। শিক্ষার্থী, রোগী, কৃষক ও সাধারণ যাত্রীরা প্রতিনিয়ত ভোগান্তি পোহাচ্ছেন। সারাবছর পানি থাকায় বছরের ১২ মাসই নৌকার উপর নির্ভর করতে হয়।
নরসিংদী-৪ (বেলাব-মনোহরদী) আসন থেকে পরপর তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগের নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন। তিনি দীর্ঘ পাঁচ বছরেরও বেশি সময় শিল্পমন্ত্রীর দায়িত্বেও ছিলেন। অথচ এত প্রভাবশালী পদে থেকেও পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের ওপর প্রতিশ্রুত সেতু নির্মাণের কোনো অগ্রগতি হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ—
“প্রতিবারই তিনি এসেছেন, আশ্বাস দিয়েছেন সেতু হবে। মানুষ সরল বিশ্বাসে সেই কথায় ভরসা করেছে। কিন্তু আজও সেতু রয়ে গেছে কেবলই স্বপ্ন।”
কলেজ ছাত্রী সৌরভী আক্তার বলেন, “অনেক সময় নৌকার জন্য বসে থাকতে হয়। দেরিতে ক্লাসে যেতে হয়। নৌকা না পেলে পরীক্ষায় দেরি হয়ে যায়।”
স্থানীয় কৃষক মোঃ শহিদ মিয়া বলেন, “এখানে সেতু হলে কৃষকদের জন্য অনেক উপকার হবে। শাকসবজি বিক্রিতে সুবিধা হবে, ফসলের ন্যায্যমূল্য পাবো।”
নৌকার মাঝি মোঃ বাচ্চু মিয়া বলেন, “৬ বছর ধরে আমি নৌকা চালাই। আমার দাদা সংগ্রামের সময় পাকিস্তানিদের গুলিতে মারা যান নৌকা দিয়ে মানুষ পারাপারের সময়। এখন প্রতিদিন আড়াই হাজার মানুষ নৌকা পার হয়, ভাড়া নেই ৫ টাকা করে। আমি চাই এখানে একটি সেতু হোক। সেতু হলে যোগাযোগ অনেক সহজ হবে।”
ইব্রাহীমপুর গ্রামের প্রকৌশলী এস. এম. শাহিনুর ইসলাম বলেন, “ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত হালগড়া এলাকায় সেতু হলে বেলাববাসীর ব্যবসা-বাণিজ্য ও জীবনমান উন্নত হবে। ভৈরবের হাসপাতালে দ্রুত চিকিৎসা পাওয়া সহজ হবে, প্রসূতি মৃত্যুহারও কমবে।”
ইব্রাহীমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি আলফাজ উদ্দিন তালুকদার বলেন, “বিগত সরকারগুলো বারবার আশ্বাস দিলেও সেতু হয়নি। আমাদের দাবি, দ্রুত সময়ের মধ্যে সেতুটি নির্মাণ করা হোক।”
সলল্লাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ জাকির হোসেন স্বপন বলেন, “এলজিইডি থেকে মাপঝোক ও মাটি পরীক্ষা হলেও পরে অদৃশ্য কারণে সেতু হয়নি। অথচ এ সেতুটি অত্যন্ত প্রয়োজন।”
বেলাব উপজেলা প্রকৌশলী গোলাম সারোয়ার বলেন, “পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ এ-শ্রেণির নদী হিসেবে চিহ্নিত। নিয়ম অনুযায়ী এ-শ্রেণির নদীর উপর এক কিলোমিটারের নিচে সেতু করা যায় না। নদীটি প্রশস্ত না হওয়ায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হয়নি। তবে সরকারের নীতিমালা পরিবর্তন হলে এখানে সেতু নির্মাণ সম্ভব।”
বেলাব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আব্দুল করিম বলেন, “নদীর শ্রেণী পরিবর্তনের বিষয়ে কাজ চলছে। আশা করি দ্রুত সময়ের মধ্যেই সেতুটি নির্মাণ করা হবে।”
সেতু নির্মাণ হলে নরসিংদী ও কিশোরগঞ্জ জেলার মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ সহজ হবে। শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী ও রোগী সবাই উপকৃত হবেন। দুই জেলার সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়নে গতি আসবে। পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের ওপর সেতু নির্মাণ এখন দুই জেলার মানুষের প্রাণের দাবি।