৪ ডিসেম্বর ১৯৭১
যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব
ঢাকা
১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বর। এ দিন ভারতীয় সামরিক বাহিনী পাকিস্তান দখলদার বাহিনীর ওপর প্রচণ্ড আক্রমণ চালায়। চতুর্দিক থেকে চলে এ আক্রমণ। ঢাকা ও চট্টগ্রামে শত্রুদের ঘাঁটিতে চলে বোমাবর্ষণ। সেইসঙ্গে আকাশে চলে বিমান যুদ্ধ।
সারাবাংলা
মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় বাহিনীর যৌথ আক্রমণের মুখে বাংলাদেশের প্রতিটি জায়গা থেকে পালানোর পথ খুঁজতে থাকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। এদিন রাতে আখাউড়ায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহনীর প্রচণ্ড গোলা বিনিময় হয়। সারারাত যুদ্ধের পর ৫ ডিসেম্বর ভোরে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে পাকিস্তানি বাহিনী। সেদিন পাকিস্তানি সৈন্যদের একটি অংশ আত্মসমর্পণ করে, কিছু সৈন্য গুলি খেয়ে মারা যায়। আর কিছু সৈন্য আখাউড়া রেললাইন ধরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দিকে পালিয়ে যায়। কিছু তিতাস নদীতে ঝাঁপ দিয়ে মারা যায়।
পাকিস্তানি সেনারা এ সময় ছিল পলায়নপর। কারণ, ভারত বাংলাদেশের পক্ষে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে যুদ্ধ শুরু করে। বাংলাদেশের ভেতরে থাকা পাকিস্তানের বিমান ঘাঁটিতে মুক্তি ও মিত্রবাহিনী ভয়াবহ বোমাবর্ষণ শুরু করে। এর পর পাকিস্তানি বাহিনী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সামনে সোজা করে দাঁড়াতে পারেনি।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের আগেই মুক্ত হয়েছিল কিছু অঞ্চল। লক্ষ্মীপুরের ইতিহাসে এক গৌরবময় দিন ৪ ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালের এই দিনে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণের মুখে পাকিস্তানি বাহিনী কৌশলে পালিয়ে যায়। লক্ষ্মীপুর সদরের অবরুদ্ধ মানুষ পায় মুক্তির স্বাদ, বিজয়ের আনন্দ।
পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে এই জেলায় প্রথম প্রতিরোধ গড়ে ওঠে এপ্রিল মাসে। বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি প্রকাশিত বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ (নবম খণ্ড) বইয়ে বলা হয়েছে, শত্রুবাহিনী যেন লক্ষ্মীপুর সদরে ঢুকতে না পারে, সে জন্য স্বাধীনতাকামী জনগণ ও মুক্তিযোদ্ধারা নোয়াখালীর চৌমুহনী থেকে লক্ষ্মীপুর সদর পর্যন্ত প্রধান সড়কের মাদাম ব্রিজ, মন্দারী বাজার ব্রিজ ও চন্দ্রগঞ্জের পশ্চিম বাজার ব্রিজ ভেঙে প্রাথমিক প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। সেই স্মৃতি হিসেবে মাদাম ব্রিজের পিলারগুলো এখনো দাঁড়িয়ে আছে।
বইটিতে উল্লেখ আছে, পাকিস্তানি বাহিনী ২৫ এপ্রিল লক্ষ্মীপুর সদরে ঢুকে বাজারডিতে সার্কেল অফিসারের কার্যালয় ও বাসভবনে প্রধান ক্যাম্প স্থাপন করে। ওই দিনই মজপুর গ্রামে হামলা চালায় এবং ৩৫ জনকে হত্যা করে। লক্ষ্মীপুরের ইতিহাসে এ ঘটনা ‘মজপুর গণহত্যা’ নামে পরিচিত। পরে তারা লক্ষ্মীপুর সদরের বাজারের বটু চৌধুরীর বাড়ি, দালাল বাজার হাইস্কুল, মান্দারী হাইস্কুল, বাজারের বড় মসজিদ, প্রবণাতন হাইস্কুল, পেয়ারাপুর, মজপুর ও আলমপুরে সাব–ক্যাম্প স্থাপন করে।
লক্ষ্মীপুর সদরে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনীর বেশ কয়েকটি যুদ্ধ হয়। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো দালাল বাজার রাজাকার ক্যাম্প অপারেশন, মান্দারী বাজার রাজাকার ক্যাম্প অপারেশন, প্রতাপগঞ্জ হাইস্কুল আক্রমণ, বড়ালিয়া অপারেশন ইত্যাদি। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধে সামরিক অভিযান (দ্বিতীয় খণ্ড) বইয়ে এমন ১৭টি সম্মুখযুদ্ধের তথ্য দেওয়া আছে।
৩ ডিসেম্বর গভীর রাতে পাকিস্তানি বাহিনী ক্যাম্পে রাজাকারদের রেখে কৌশলে নোয়াখালীর চৌমুহনীর দিকে পালিয়ে যায়। ৪ ডিসেম্বর সকালে সেই খবর ছড়িয়ে পড়তেই মুক্তির আনন্দে উল্লাসে ফেটে পড়েন লক্ষ্মীপুরের মানুষ।
ওই বিকেলে অভূতপূর্ব এক দৃশ্য দেখা যায় লক্ষ্মীপুরে। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে দাঁড়াতে এলাকার হাজার হাজার মানুষ মিছিল নিয়ে রাস্তায় নেমে আসেন। হাতে লাঠি, বাঁশ, কাস্তে—যা পেয়েছেন, তা নিয়েই ছুটে এসেছেন তাঁরা। মনে হচ্ছিল, আর কোনো শক্তিই বিজয় আটকে রাখতে পারবে না।
জেলার রাজাকার কমান্ডার আবদুল হাইয়ের নেতৃত্বে ওই দিন রাতে মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হয়। তখন মুক্তিযোদ্ধা আবু সাঈদ মারা যান। আহত হন আরও তিনজন।
বিদেশ
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এই দিনটি বাংলাদেশের জন্য ছিল অস্থিরতা আর উদ্বেগের। কারণ, এদিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি সিনিয়র জর্জ বুশ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে পাকিস্তানের পক্ষে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব উত্থাপন করেন। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে, ‘এই মুহূর্তে ভারত ও পাকিস্তান নিজ নিজ সীমান্তের ভেতর সৈন্য প্রত্যাহার করে নিতে হবে।’
যখন এ রকম উৎকণ্ঠা অবস্থা, তখন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ লিখিতপত্রে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির কাছে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব পাস করানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র তখন বৈঠকের পর বৈঠক করছে। সবাই যখন চরম উদ্বেগ আর চিন্তায়, তখন এলো খুশির সংবাদ। সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেটোর কারণে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব নিরাপত্তা পরিষদে ভেস্তে যায়। পোল্যান্ডও এ প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেয়। তবে ফ্রান্স-ইংল্যান্ড এ যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে ভোটদানে বিরত থাকে। যুক্তরাষ্ট্র হেরে যাওয়ার পর পাকিস্তানের পরাজয় সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।
Leave a Reply