প্রথম স্বামীকে আইনত তালাক না দিয়ে পুনরায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার বিষয়ে কঠোর আইনি ও ধর্মীয় ব্যাখ্যা দিয়েছেন ঢাকা মেট্রো বারের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং মহানগর দায়রা জজের সাবেক পিপি অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ। তিনি অত্যন্ত জোরালো ভাষায় বলেন, ‘বিবাহ বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের মৌখিক দাবি বা অস্পষ্টতার সুযোগ নেই। যেহেতু আগের বিবাহটি যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় নিবন্ধিত (রেজিস্ট্রি) ছিল, তাই তার বিচ্ছেদও অবশ্যই আইনি রেজিস্ট্রির মাধ্যমেই সম্পন্ন হতে হবে।তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, প্রথম স্বামী বর্তমান থাকা অবস্থায় এবং বৈধ বিচ্ছেদ ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করা কেবল দেশের প্রচলিত আইনের চরম লঙ্ঘনই নয়, বরং এটি ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ী সম্পূর্ণ ‘হারাম’ এবং ব্যভিচারের শামিল।
জেবা আমিনা আহমেদের এই কর্মকাণ্ডকে একটি গুরুতর ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি জানান, আইনের চোখে এমন জালিয়াতি ও চারিত্রিক স্খলনের কোনো ক্ষমা নেই।
বিচ্ছেদের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করতে গিয়ে মোকাররম হোসেন খান এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, জেবা আমিনা যখন লন্ডন থেকে ফিরে তাকে বিয়ে করেন, তখন জেবা ছিল আকণ্ঠ দেনায় নিমজ্জিত—যা বিয়ের আগে সুকৌশলে গোপন রাখা হয়েছিল। বিয়ের পর থেকেই জেবার আসল রূপ প্রকাশ পেতে থাকে; মিথ্যা তথ্য ও সুনিপুণ প্রতারণার জালে জড়িয়ে তিনি মোকাররম হোসেনের মালিকানাধীন কোম্পানি থেকে বিপুল অংকের টাকা হাতিয়ে নেন, যা পরবর্তীকালে আর ফেরত দেননি। তার এই চরম অর্থলোভ ও উগ্র আচরণের প্রভাব পড়ে পারিবারিক জীবনেও। মোকাররম হোসেনের সন্তানদের সাথে অমানবিক আচরণ এবং তাদেরকে ঘর থেকে বের করে দেওয়ার ক্রমাগত চেষ্টার ফলে দাম্পত্য কলহ চরমে পৌঁছায়। এই অস্থির সময়ের মধ্যেই জেবা আমিনা বিএনপিতে যোগ দিয়ে নিজের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন। শুধু তাই নয়, কৌশলে মোকাররম হোসেনের কয়েকটি কোম্পানির শেয়ার নিজের নামে লিখে নিলেও তার বিপরীতে কোনো অর্থ পরিশোধ করেননি, যার অকাট্য প্রমাণ কোম্পানির অডিট রিপোর্টে বিদ্যমান।
প্রতারণার এখানেই শেষ নয়; বিচ্ছেদের পর তিনি উল্টো কোম্পানি কোর্টে মামলা ঠুকে দিয়ে এবং ‘স্ট্যাটাস কো’ (স্থিতাবস্থা) আদেশের সুযোগ নিয়ে বারিধারা ডিপ্লোমেটিক এলাকার একটি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট অবৈধভাবে দখল করে আছেন। নিজের দখলদারিত্ব টিকিয়ে রাখতে তিনি মোকাররম হোসেনের স্বাক্ষর জালিয়াতি (ফটোপেস্ট) করে একটি ভুয়া চুক্তিপত্র আদালতে দাখিল করেন। এই জালিয়াতির বিরুদ্ধে পরবর্তীতে থানায় একটি জিআর মামলা (মামলা নম্বরঃ ৩০(৮)১৭) দায়ের করা হয়, যা এই নেত্রীর সীমাহীন ধূর্ততা ও জালিয়াতির এক জীবন্ত দলিল।
মোকাররম হোসেন খান জেবা আমিনার বিরুদ্ধে এক লোমহর্ষক ও দুর্ধর্ষ হামলার অভিযোগ এনে বলেন, ‘আমি এক অত্যন্ত গুরুতর ও বর্বরোচিত ঘটনার দিকে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। ২০২৫ সালের ২৭ শে জুন, ঈদুল আজহার ছুটিতে আমি যখন সপরিবারে দেশের বাইরে ছিলাম, ঠিক সেই সুযোগে জেবা আমিনার প্রত্যক্ষ কমান্ডে হিজরাসহ ১০-১৫ জনের একটি সশস্ত্র সন্ত্রাসী ও গুন্ডাবাহিনী আমার ভবনে তাণ্ডব চালায়। রাত আনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে বারিধারার বাসভবনে প্রবেশ করে আমার মূল বাসভবন (অ্যাপার্টমেন্ট ২০১) এবং আমার সন্তান মাহিরা হোসেন খান ও মেরাজ হোসেন খানের পরিবারসহ বসবাসের স্থান (অ্যাপার্টমেন্ট ৪০১)-এ জোরপূর্বক হানা দেয়। তারা পুরো ভবন দখলে নেওয়ার উদ্দেশ্যে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়, যার সিসিটিভি ও ভিডিও ফুটেজ আমার কাছে সংরক্ষিত আছে। এবং তারা আলমারি ও লকার ভেঙে আমার বেশ কিছু দামি ঘড়ি, ল্যাপটপ, মোবাইল, স্বর্ণালঙ্কার, ক্যাশ টাকা ও আরও অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি করে নিয়ে যায়।
এ বিষয়ে আমি বিদেশ থেকে ফিরে এসে একটা সংবাদ সম্মেলন করি এবং বিভিন্ন পেপার-পত্রিকা বিষয়টি ফলাও করে ছাপাও হয় এবং বারিধারা ডিপ্লোমেটিক এরিয়াতে যারা বসবাস করে এবং বারিধারা সোসাইটিও বিষয়টি অবগত এবং ওই সময় আমি দেশে না থাকায় তারা আমাকে নানাভাবে সাহায্যও করেছিল।
তিনি আরও জানান, এই সহিংসতা জেবা আমিনার জন্য নতুন কিছু নয়। এর আগেও ২০১৮ সালে তিনি একইভাবে অ্যাপার্টমেন্ট দুটি দখলের অপচেষ্টা চালিয়েছিলেন, যার পরিপ্রেক্ষিতে গুলশান থানায় একটি মামলা (নং ১৩(১২)১৮) দায়ের করা হয়েছিল। সাম্প্রতিক এই সশস্ত্র অনুপ্রবেশ ও হামলার ঘটনায় মোকাররম হোসেন খান কেবল থানায় সাধারণ ডায়েরিই করেননি, বরং ঢাকার সিএমএম আদালতে একটি সুনির্দিষ্ট সিআর মামলাও (নং ৩৫১৬/২৫) দায়ের করেছেন, যার পুলিশি প্রতিবেদন দাখিল হয়েছে।
বিদেশের মাটিতে দেউলিয়া এবং দেশে দখলদারিত্বের এমন ভয়ানক মিশেল এই নেত্রীর উগ্র ও অপরাধপ্রবণ মানসিকতাকেই নগ্নভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। মোকাররম হোসেন খান জানান, অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, সম্পূর্ণ ভবনে তার নামে কোনো অ্যাপার্টমেন্টের মালিকানা না থাকলেও তিনি গায়ের জোরে একটি ফ্ল্যাট দখল করে আছেন। মূলত, একটি ‘কোম্পানি স্যুট’-এর আইনি মারপ্যাঁচে হাইকোর্ট থেকে প্রাপ্ত স্থিতাবস্থা (স্ট্যাটাস কো) আদেশের আড়ালে জেবা আমিনা এই দখলদারিত্ব টিকিয়ে রেখেছেন। আইনি এই জটিলতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তিনি প্রকৃত মালিকের অধিকার খর্ব করছেন।
বর্তমানে মামলাটি উচ্চ আদালতে বিচারাধীন থাকলেও, মালিকানা ছাড়াই ফ্ল্যাটটি আঁকড়ে রাখার এই প্রবণতা তার দখলদারী মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ বলে তিনি দাবি করেন।
মোকাররম হোসেন খান বলেন, বিএনপি সর্বদা পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতৃত্বের ওপর গুরুত্বারোপ করে। তাই জেবা আমিনা আহমেদের এসব অনৈতিক কর্মকাণ্ড, আইনি জালিয়াতি ও অপকর্মের আদ্যোপান্ত তুলে ধরে আমি দলের শীর্ষ নেতৃত্ব তথা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক পত্র প্রেরণ করেছি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, দলের ভাবমূর্তি রক্ষায় এবং ন্যায়ের স্বার্থে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই গুরুতর অভিযোগগুলো আমলে নিয়ে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
জেবা আমিনার সীমাহীন লোভ ও অনৈতিকতার শিকার হতে হয়েছে তার নিজ পরিবারকেও। গুলশান ২ নম্বরের ১০৮ নম্বর রোডে অবস্থিত ১৭ নম্বর প্লটটি ছিল তার বাবার রেখে যাওয়া পৈত্রিক সম্পত্তি, যা কনকর্ড আতিয়া নামে পরিচিত। অভিযোগ উঠেছে যে, প্লটটি ডেভেলপার কোম্পানির মাধ্যমে বহুতল ভবন নির্মাণের পর গত ১৫ বছর ধরে জেবা আমিনা ক্ষমতার দাপটে পুরো ভবনের মালিকানা এককভাবে কুক্ষিগত করে রেখেছেন। শরীয়াহ এবং উত্তরাধিকার আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তিনি তার আপন তিন বোন—লাবিবা আহমেদ, দিবা আহমেদ ও আরবা আহমেদ এবং তার প্রয়াত ভাইয়ের দুই নাবালক সন্তান হেশাম ও হাসানের প্রাপ্য অংশ বুঝিয়ে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছেন।
পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া তাদের ন্যায্য ফ্ল্যাটগুলো অবৈধভাবে দখল করে রাখা শুধু নয়, বরং সেই ফ্ল্যাটগুলো ভাড়া দিয়ে প্রাপ্ত বিপুল অর্থ তিনি দীর্ঘ দেড় দশক ধরে একাই ভোগ করে আসছেন। প্রতারণার এই জাল পরিবারের গণ্ডি পেরিয়ে সাধারণ ক্রেতাদের ওপরও বিস্তৃত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, জেবা আমিনা একটি নির্দিষ্ট ফ্ল্যাট দুইজন পৃথক ব্যক্তির কাছে সুকৌশলে বিক্রি করেছেন এবং উভয় ক্রেতার কাছ থেকেই বিক্রয়মূল্যের মোটা অংকের টাকা গ্রহণ করে আত্মসাৎ করেছেন।
শুধু আর্থিক জালিয়াতিই নয়, মোকাররম হোসেন খান তার বিরুদ্ধে এক চরম অমানবিক ও হৃদয়বিদারক অভিযোগ তুলে ধরেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমাদের সংসারে একটি কন্যা সন্তান রয়েছে, যার বাবা আমি। কিন্তু জেবা আমিনা এতটাই নিষ্ঠুর যে, আমার সেই অসুস্থ মেয়েটির সঙ্গে আমাকে এবং ভাইবোনদের দেখাও করতে দেয় না। ’
একজন গর্ভধারিণী মায়ের এমন প্রতিহিংসাপরায়ণ আচরণ এবং আপনজনদের সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার ঘটনাটি সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের এক চরম দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিযুক্ত জেবা আমিনা খান ওরফে জেবা আলগাজীর জীবনকাহিনি যেন এক সুনিপুণ জালিয়াতি ও নৈতিক স্খলনের উপাখ্যান। অর্থের প্রতি তার মোহ তাকে এক নীতিহীন প্রতারকে পরিণত করেছে। সাহায্যের নামে মানুষের বিশ্বাস পুঁজি করে তিনি যে ঋণের পাহাড় গড়েন, যা শোধ করার কোনো সদিচ্ছা তার নেই। বরং অন্যের টাকায় বিলাসি জীবনযাপন করাই তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। তার জীবনের পরতে পরতে মিশে আছে প্রতারণার ছাপ। তার এ ধরনের ভয়াবহ জালিয়াতি ও বাড়ি দখলের চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস হওয়ায় রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে তীব্র তোলপাড় শুরু হয়েছে। একজন রাজনৈতিক নেত্রীর এমন দ্বিমুখী জীবন ও নীতিহীনতা এখন জনমুখে আলোচনার প্রধান খোরাক।
উল্লিখিত একাধিক অভিযোগের বিষয়ে মহিলা দলের সহ-সভাপতি জেবা আমিনা আহমেদ ওরফে জেবা আমিনা আলগাজী বলেন, ‘প্রথম স্বামীর সঙ্গে মৌখিক তালাকের মাধ্যমে বিবাহবিচ্ছেদ হয়। ইসলামী শরীআ অনুসারে কোনো নারীর তিন ইদ্দ্যত পার হলে তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারেন- ইসলাম তাই বলে।
তিনি আরও বলেন, ‘প্রথমে মৌখিকভাবে তালাক হলেও পরবর্তীতে ২০০৭ সালে প্রথম স্বামীর সঙ্গে লন্ডনে আদালতের মাধ্যমে ডিভোর্স হয়। এরপর সম্পদের অংশ পেতে মামলা করি। সেটিও নিষ্পন্ন হয়েছে। ’
লন্ডনে কোম্পানি দেউলিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে জেবা আমিনা আহমেদ বলেন, ‘দেউলিয়া নয়; লিকুয়েডেশন করে ব্রিটিশ সরকার’। আর অন্যান্য অভিযোগকে তিনি মিথ্যা দাবি করেন।
Leave a Reply