
ফরিদুল আলম ফরিদ: ঢাকা, ১৮ এপ্রিল ২০২৬: মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা ও ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির আশঙ্কায় বাংলাদেশে জ্বালানি তেল নিয়ে ব্যাপক ‘তেলেসমাতি’ শুরু হয়েছে। একদিকে ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইন, অন্যদিকে কালোবাজারি, মজুতদারি ও চুরির ঘটনায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে।
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পেট্রোল ও অকটেনের জন্য ফিলিং স্টেশনে সাপের মতো লাইন দেখা যাচ্ছে। অনেক স্টেশনে ‘তেল নেই’ লিখে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। পরিবহন শ্রমিক ও সাধারণ যাত্রীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তেল না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরছেন। কোথাও কোথাও জোর করে তেল নেওয়ার চেষ্টা, মারামারি এবং খুনের ঘটনাও ঘটেছে।
প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে উদঘাটিত হয়েছে বহু মজুতদারির ঘটনা। বসতবাড়ি, গোয়ালঘর, বাঁশঝাড়ের নিচে লুকিয়ে রাখা হাজার হাজার লিটার ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোল জব্দ করা হয়েছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও র্যাবের অভিযানে কয়েক কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে এবং কয়েক ডজন মজুতদারকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
সরকারের তরফে বারবার আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে যে, দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক তথ্য অনুসারে, এপ্রিল-মে মাসের জন্য ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও ফার্নেস অয়েলের মজুত স্বাভাবিক চাহিদার চেয়ে যথেষ্ট। এপ্রিল মাসে জ্বালানি তেলের দামও অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। তবু আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা এবং আমদানি প্রক্রিয়ায় কিছু বিলম্বের কারণে সাময়িক চাপ তৈরি হয়েছে। তবে সরকার বিকল্প উৎস থেকে আমদানি বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে জনগণকে অপচয় না করার এবং অতিরিক্ত তেল না কেনার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সাধারণ নাগরিকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, “সরকার বলছে তেল আছে, অথচ পাম্পে তেল নেই। এটা স্রেফ একটা তেলেসমাতি।” পরিবহন মালিকরা জানিয়েছেন, এভাবে চলতে থাকলে যাত্রী ভাড়া বাড়ানো ছাড়া উপায় থাকবে না।
প্রশাসন জানিয়েছে, মজুতদারি ও কালোবাজারির বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে সরবরাহ ব্যবস্থাপনা আরও জোরদার করা হচ্ছে।
তেলেসমাতির এই অধ্যায় কবে শেষ হবে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে উদ্বেগ বিরাজ করছে। সরকারের স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ ও কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে দ্রুত স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনার দাবি উঠেছে সর্বত্র।
গতকাল পর্যন্ত পরিস্থিতি (এপ্রিল ২০২৬):
বাংলাদেশ সরকার এপ্রিল মাসের জন্য জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রেখেছে। ভোক্তা পর্যায়ে গতকাল পর্যন্ত মূল্য ছিলো নিম্নরূপ:
ডিজেল: ১০০ টাকা/লিটার
পেট্রোল: ১১৬ টাকা/লিটার
অকটেন: ১২০ টাকা/লিটার
কেরোসিন: ১১২ টাকা/লিটার
এই দাম ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাস থেকে অব্যাহত ছিলো। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুসারে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির সাথে জনগণের ভোগান্তি কমাতে দাম সামান্য বাড়ানো হয়েছে।
আজ থেকে তেলের দাম নিম্নরূপ:
ডিজেল: ১১৫ টাকা/লিটার
পেট্রোল: ১৩৫ টাকা/লিটার
অকটেন: ১৪০ টাকা/লিটার
কেরোসিন: ১৩০ টাকা/লিটার
বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশে ভোক্তা পর্যায়ে ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রোলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। আজ রোববার (১৯ এপ্রিল) থেকে সারা দেশে নতুন নির্ধারিত দামে বিক্রি হবে এসব জ্বালানি তেল।
শনিবার (১৮ এপ্রিল) বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই মূল্য সমন্বয়ের কথা জানানো হয়।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মুহাম্মদ আরিফ সাদেক স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, প্রতি লিটার জ্বালানি তেলের নতুন দাম হবে- অকটেন প্রতি লিটার ১৪০ টাকা, পেট্রোল প্রতি লিটার ১৩৫ টাকা, কেরোসিন প্রতি লিটার ১৩০ টাকা এবং ডিজেল প্রতি লিটার ১১৫ টাকা।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নতুন এই দাম কার্যকর হওয়ার ফলে রোববার থেকে দেশের সকল ফিলিং স্টেশন ও পরিবেশক পর্যায়ে এই নির্ধারিত মূল্যে জ্বালানি তেল বিক্রি করতে হবে।
এর আগে গত ৩১ মার্চ বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক অফিস আদেশে বলা হয়, ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম এপ্রিলে প্রতি লিটার ১০০ টাকা করা হয়েছে। কেরোসিনের দাম প্রতি লিটার ১১২, পেট্রোলের দাম প্রতি লিটার ১১৬ ও অকটেনের দাম ১২০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফেব্রুয়ারি ও মার্চে এ দামে বিক্রি হয়েছে জ্বালানি তেল।
এর আগে জানুয়ারিতে প্রতি লিটারে ২ টাকা ও ফেব্রুয়ারিতে আরও ২ টাকা করে কমানো হয়েছিল জ্বালানি তেলের দাম।
Leave a Reply