
অগ্রণী ব্যাংকের নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর শাখায় একটি বড় ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে। রংপুর সার্কেল প্রধান জিএম স্বপন কুমার ধর ও সৈয়দপুর শাখার সিনিয়র অফিসার আলিমুল আল রাজি তমালের যোগসাজশে জালিয়াতি করে বিভিন্ন ভাউচারের মাধ্যমে নগদ ও ক্লিয়ারিং সাসপেন্স একাউন্ট থেকে আরটিজিএসের মাধ্যমে বিভিন্ন একাউন্টে শাখার ৬৬ কোটি টাকা তুলে পাচার করেছে দুবাই। এরমধ্যে তমাল এখন পলাতক রয়েছে।
জানা গেছে, রংপুর সার্কেল প্রধান জিএম স্বপন কুমার ধর ও সিনিয়র অফিসার আলিমুল আল রাজি তমাল তারা দুজনে শাখার সকল কম্পিউটারের পার্স ওয়ার্ড গোপনে ব্যবহার করতেন। এই অর্থ পাচারের সাথে ব্যাংকের এমডিসহ শাখার ২৩ জন কর্মকর্তা জড়িত। পাচারের পুরো বিষয়টি জানতেন, ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক
(এমডি) আনোয়ারুল ইসলাম নিজেও। এমডি এই অর্থ আত্মাসাৎ করার জন্য মুলত তমালকে ওখানে বদলি করে পাঠিয়েছেন বলে জানান ব্যাংকের সংশ্লিষ্টরা।
সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের পতনের পর বর্তমান এমডি আনোয়ারুল ইসলাম নিয়োগ পান। নিয়োগ পাওয়ার পরেই স্বজনপ্রতি শুরু করেন। নিজের লোকদের পছন্দ মতো জায়গায় বদলি ও পদোন্নতি দিচ্ছেন তিনি। এরমধ্যে জিএম স্বপন কুমার ধর ও আলিমুল আল রাজি তমাল ছিল তার পছন্দের ব্যক্তি। জালিয়াতির সময় জিএম স্বপন কুমার ধর সে সময় ওখানেই ছিল। তমালকে বদলি করে সৈয়দপুর শাখায় পাঠিয়েছে এমডি। তাকে বদলি করার উদ্দেশ্য ছিল যোগসাজশে অর্থ সরানো। তাই সৈয়দপুর শাখার জিএম স্বপন কুমার ধর ও সিনিয়র অফিসার তমাল এবং এমডির যোগসাজশে এই ৬৬ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। এরমধ্যে জিএম স্বপন কুমার ধর কয়েক কোটি টাকা ইসকনে উপহার পাঠিয়ে বলে ব্যাংকের সংশ্লিষ্টরা জানান।
আরো জানা গেছে, সিনিয়র অফিসার আলিমুল আল রাজি তমাল জুলাই গণঅভ্যুত্থানে পর বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন। শাখার স্টাফদের সাথে এক ধরনের ক্ষমতা দেখাতেন। তখন তার হঠাৎ পরিবর্তন মানুষের মধ্যে এক ধরণের মিশ্রপ্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছিল। কিন্তু কেউ বুঝতে পারেনি, তিনি ও জিএম মিলে ব্যাংক থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ সরিয়ে পাচার করছে।
অগ্রণী ব্যাংকের সূত্রে জানা গেছে, গত ১১/৩/ ২০২৪ থেকে ১৩/১০/ ২০২৫ সাল পর্যন্ত সৈয়দপুর শাখাতে কোনো প্রকার অর্থ জালিয়াতি ধরা পড়েনি। তবে গত ১৫/০১/২৬ সালের একটি পত্র দাখিল করা হয়। যার বিষয়বস্ত ছিল সৈয়দপুর শাখা, নীলফামারীর সিএনসি হিসাবের ৩১/১২/২০১৫ সাল পর্যন্ত ৩৭ কোটি ৭ লাখ ৩৪ হাজার ৮১১ টাকার হিসেবে গড়মিল পাওয়া গেছে। এই হিসাব বের করতে গিয়ে তদন্তে বেড়িয়ে আসে ৬৬ কোটি টাকার গড়মিল। যা পুরো টাকা জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মাসাৎ করেছে এমডি ও তমালসহ ২৩ কর্মকর্তা।
গত ১৫ জানুয়ারি ৬ বিশিষ্ট একটি তদন্ত টিম গঠন করা হয়। এই তদন্ত টিম ২৫ জানুয়ারি প্রতিবেদন দাখিল করেন। সেখানে এই অর্থ আত্মসাতে ২৩ জনের নাম উল্লেখ করেছেন। এর মূলহোতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন সৈয়দপুর শাখার সিনিয়র অফিসার আলিমুল আল রাজি তমাল ও সৈয়দপুর শাখার জিএম স্বপন কুমার ধর।
তারা বিভিন্ন ভাউচারের মাধ্যমে নগদ ও চেক ক্লিয়ারিংয়ের করে আরটিজিএসের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করেছে। এই অর্থ আত্মসাতের সাথে জড়িত ২৩ জন। এই অর্থ সরাতে সহযোগিতা করেছেন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আনোয়ারুল ইসলাম। এছাড়া আরো যারা রয়েছেন, সৈয়দপুর শাখার এসপিও মনিরুজ্জামান, পিও জায়েম, এসও (সুপারনিউমেরারী) আব্দুল খালেক সরকার, সিনিয়র অফিসার শাহনাজ বেগম, অফিসার (ক্যাশ) তমাল চন্দ্র রায়, সিনিয়র অফিসার (অবঃ) আব্দুল ওয়াজেদ, সিনিয়ন অফিসার (সুপার নিউমেরারী) মো. তাইজুল ইসলাম, সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার মো. আব্দুল লতিফ, অফিসার (ক্যাশ) মো. মাইদুল ইসলাম, সিনিয়র অফিসার মো. আমিরুল ইসলাম ও এসও মো. আক্তারুজ্জামান।
সূত্রে আরো জানা গেছে, টাকা পাচারে আলিমুল আল রাজি তমাল জড়িত থাকলেও তার নামে কোনো প্রকার মামলা করা হয়নি। শাস্তিস্বরূপ বদলি করা হয়েছে ১৩ জনকে। আলিমুল আল রাজি তমালকে কোনো প্রকার জবাব চেয়েও চিঠি দেয়া হয়নি এমডি। তাকে শাস্তিস্বরূপ বদলি বা মামলা করা হয়নি।
তদন্তের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন মো. আলিমুল আল রাজি তমাল সিনিয়র অফিসার সৈয়দপুর শাখা, নীলফামারীতে ১৭/০৭/২০২০ সালে যোগদান করেন। যোগদান পরবর্তীতে তিনি শাখার এনজি, আরটিডিএস, ইএফটি, ফরেন রেমিট্যান্স এবং ব্যাচ ক্লিয়ারিংয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। অথচ তিনি ২০১৫ সালের অফিসার (ক্যাশ) হিসেবে যোগদানকারী একজন কর্মকর্তা। উক্ত কর্মকর্তার দিনশেষে ভাউচার শাখা ব্যবস্থাপক কর্তৃক ভেরিফাই করার কোন প্রমাণ তদন্ত দল পরিলক্ষিত হয়নি। তিনি ০১/০১/২০২৬ থেকে অত্র শাখায় তার কর্মক্ষেত্রে বিনা অনুমতিতে অনুপস্থিত রয়েছেন। নথি দৃষ্টে প্রতীয়মান হয় উক্ত কর্মকর্তা কোন ছুটিও গ্রহণ করেননি।
তদন্তে জানা যায়, তিনি পূর্বের শাখাসহ দীর্ঘ ৮ বছর যাবত ক্লিয়ারিং ডেস্কে কাজ করছেন। অতিবিলাসী জীবনযাপনে করেছেন বলে শাখার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তিনি বেপরোয়া ভাবে ব্যাংকের নিয়মনীতি তোয়াক্তা না করে ব্যাংকের সুনাম ক্ষুন্ন করেছেন এবং সেইসাথে শাখার তথা ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন মর্মে তদন্তদলের নিকট প্রতীয়মান হয়েছে।
তদন্তে আরো জানা যায়, মো. আলিমুল আল রাজি তমাল, সিনিয়র অফিসার (সুপার নিউমেরারী) এর বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের প্রাপ্ত অভিযোগ তদন্তে দেখা যায় যে, তিনি মোট সিএনজি লেজারে ১৩২,২৬,২২,৯৮১.০০ (একশত বত্রিশ কোটি হাজিশ লক্ষ বাইপ হাজার নয়শত একাশি) টাকার লেনদেন ( ডেবিট ও ক্রেডিট উভয়ই) সৃষ্টি করেন এবং সম্পন্ন করে মিলিয়ে রাখেন, যা সম্পূর্ণরূপে ফিকটিশাস/ ভুয়া। এক্ষেত্রে উক্ত অসদুপায় অবলম্বনকারী কর্মকর্তা ০৩/১২/২৬২৫ এবং ২৮/১২/২০২৫ তারিখে সিএনডি লেজারে যথাক্রমে ৩০,০০,০০০,০০ (ত্রিশ কোটি) টাকা এবং ৭,০৭,৩৪,৮১১. ০০ (সাত কোটি সাত লাখ চৌত্রিশ হাজার আটশত এগার) টাকা ভুক্তি প্রদান করেন। দেখা যায়, ০৬/১২/২০২৫ তারিখে ইস্যুকৃত ৫.৭৮,৩৪,৮১১.০০ (পাঁচ কোটি আটাত্তরলাখ চৌত্রিশ হাজার আটশত এগার) টাকার ১টি আইবিডিএ এর বিপরীতে ০৫ চেক কালেকশন করলেও আইবিডিএ টি রেসপন্ড না করে উক্ত কর্মকর্তা তার ড্রয়ারে ফেলে রাখেন।
ফলে দেখা যায়, ২টি অসন্বিত পোর্টিং এবং ১টি আইবিডিএ অর্থাৎ (৩০,০০,০০,০০০,০০+৭,০৭,৩৪,৮১১.০০ + ৫,৭৮,৩৪,৮১১.০০) = ৪২,৮৫,৬৯,৬২২.০০ (বিয়াল্লিশ কোটি পঁচাশি লক্ষ উনসত্তর হাজার ছয়শাত বাইশ) টাকার হিসাব বহির্ভূত স্থিতি সৃষ্টি করেন। তদন্তে আরো দেখা যায়, পূর্বে সমপরিমাণ টাকার আত্মসাতের অর্থ তিনি সমন্বয় করতে না পারায় সম্পূর্ণ স্থিতি হিসাবে রয়ে যায়। উপরোক্ত সিএনজি লেজারে ভূক্তি ২ টির বিষয়ে প্রধান কার্যালয়ের রিকনসিলিয়েশন ডিডিশনের মাধ্যমে শাখা প্রথম অবগত হয়। এতে স্পষ্টতঃ যে, মো. আলিমুল আল রাজি তমাল এ পর্যায় উক্ত স্থিতি সমন্বয়ের আর সুযোগ পাননি। তদন্তদল কর্তৃক নথিপত্র বিশ্লেষণে প্রতীয়মান হয় যে, উক্ত সম্পূর্ণ টাকা ইতিমধ্যে আত্মসাৎ করা হয়েছে।
তদন্তে প্রাপ্ত নথিপত্র বিশ্লেষণে প্রতীয়মান হয় যে, আঞ্চলিক কার্যালয় ০৭/০৩/২০২৪, ২৪/০২/২০২ ও ০৯/০৯/২০২৫ এবং ১৪/০৫/২০২৫ সালে অত্র শাখা পরিদর্শন করেন। উল্লেখিত পরিদর্শন প্রতিবেদনে অঞ্চল প্রধানের স্বাক্ষর পাওয়া যায়, পরিদর্শন প্রতিবেদনে আরো ০২ জন কর্মকর্তার কথা উল্লেখ থাকলেও ইনিশিয়াল স্বাক্ষর ভিন্ন অন্য কোন পরিচয় পাওয়া যায়নি। প্রধান কার্যালয় কর্তৃক ইস্যুকৃত সার্কুলার এবং প্রতিবেদনের নিয়মানুযায়ী অত্র শাখা পরিদর্শনের কোন দালিলিক প্রমাণ তদন্তে পাওয়া যায় নাই।
উল্লেখিত অসমন্বিত লেজারসমূহের সমন্বয়করণের কোন নির্দেশনা নথিভুক্ত অবস্থায় তদন্তদলকে শাখা কর্তৃক প্রদান করতে পারে নাই। তদন্তকালীন আঞ্চলিক কার্যালয় হতে কিছু নথি পাওয়া যায় যেখানে অঞ্চল প্রধান ১৫/০১/২০২৬ তারিখে উক্ত অসমন্বিত লেজার সম্পর্কিত একটি পত্র সার্কেল সচিবালয় মহাব্যবস্থাপক মহোদয়কে অবগত করা হয়েছে। এছাড়া নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের পরিদর্শনের বা নির্দেশনার কোন পত্র/নথি/ফাইল তদন্তদল তদন্তদলকালীন পায়নি।
আত্মসাৎকৃত অর্থ সৈয়দপুর শাখার জিএম স্বপন কুমার ধর ও সিনিয়র অফিসার মো. আলিমুল আল রাজি তমাল স্বীয় বুদ্ধি প্রয়োগে আত্মসাৎ করেছেন। ৪২ কোটি ৮৫ লাখ ৬৯ হাজার ৬২২ টাকা আত্মসাতের প্রমানদি পাওয়া গেছে।
এছাড়া আরো বেশ কিছু ভাউচার দিয়ে ২৪ কোটির টাকার মতো আত্মসাৎ করেছে। ডেইলি বেসিসে এনজি রিকনসিলিয়েশন ব্যবস্থা না করে দীর্ঘ সময় অর্থাৎ মাসিক ভিত্তিক সমন্বয় হওয়ার কারনে অনিয়মটি সংঘটিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। টি-২৪ এ এন্ট্রি হওয়া মাত্র সিএমও সিএনজি হেডে এন্ট্রি হওয়ার বাধ্যবাধকতা না থাকাও উল্লেখিত অনিয়ম সংগঠিত হওয়ার আরেকটি উল্লেখযোগ্য কারণ। তিনি প্রায় ৬৬ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। তিনি শাখার সকলের আইডি, পাসওয়ার্ড গোপনে যা চাতুর্যতার সাথে ব্যবহার করেছেন মর্মে শাখারর বর্তমান কর্মকর্তারা তদন্তদলকে জানিয়েছেন। তারা নিজেদেরকে নির্দোষ দাবী করেছেন।
অগ্রণী ব্যাংকের এমডি আনোয়ারুল ইসলামকে এব্যাপারে জড়িত আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি জানান, ‘সারাদেশে অগ্রণী ব্যাংকের ১ হাজারের কাছাকাছি শাখা রয়েছে। সকলের সাথে কি এমডিদের সাথে সর্ম্পক থাকে। ব্যাংকের নিচের স্টাফদের দেখাশুনা করার জন্য শাখায় এজিএম ও ডিজিএম এবং জিএম রয়েছে। এখানে একজন এমডির সাথে যোগাযোগ থাকার কথা নয়। তবে যারা এই অর্থ আত্মসাতের সাথে জড়িত তাদের সকলকেই আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।’
অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বলেন, ‘সৈয়দপুর শাখাতে একটি অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। ঘটনা জানার সাথে সাথেই একটি তদন্ত টিম গঠনা করা হয়েছে। যারা জড়িত সবার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ব্যাংকের সুশাসন ফিরিয়ে আনতে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।’
তিনি আরো বলেন, ‘সত্যিই ব্যাংকের মধ্যে এ ধরণের ঘটনা চিন্তাও করতে পারি না। এটার জন্য লজ্জিত ও খুবই দুঃখিত। ব্যাংকটি ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য যেখানে আমরা কাজ করছি, সেখানে এধরনের ঘটনা মেনে নিতে পারছি না। এভাবে ব্যাংকের মধ্যে ঘটনা ঘটলে সাধারণ মানুষের আস্থাও থাকবে না ব্যাংকের প্রতি। ’
Leave a Reply