
বাংলাদেশের অধিকাংশ রিহ্যাব সেন্টারগুলো ‘পুনর্বাসন’ শব্দের আড়ালে যে অন্ধকার সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে—তা এখন এক ভয়ংকর মানবিক বিপর্যয়। এখানে চিকিৎসা নয়—মানসিক ভাঙন, শারীরিক অবহেলা এবং সম্পর্ক ধ্বংস করে দেওয়া মনস্তাত্ত্বিক শোষণই যেন নিয়ম।
অতিরিক্ত রোগী ভর্তি: অনুমোদনের সীমা পেরিয়ে নরকযন্ত্রণা। যে প্রতিষ্ঠানের অনুমতি ২০–২৫ জনের—সেখানে রাখা হয় ৫০, ৬০, এমনকি ৮০ জন পর্যন্ত।
এই অতিরিক্ত ভিড়ের বাস্তবতা:
পর্যাপ্ত বেড নেই, নোংরা, দুর্গন্ধময় কক্ষ, ভেজাল বা অপ্রতুল খাবার, অদক্ষ কর্মীদের হাতে রোগী, নিরাপত্তাহীনতা ও শারীরিক নির্যাতনের একাধিক অভিযোগ।
একজন কর্মীর স্বীকারোক্তি—“যেখানে ২০ জনের জায়গায় ৬০ জন গাদাগাদি করে থাকে, সেখানে সেবা নয়—শুধুই বেঁচে থাকার লড়াই।”
রোগীর ভাষায়—“আমি চিকিৎসা নিতে যাইনি, আমাকে বন্দি করা হয়েছিল”।
প্রতিদিনই রোগীরা জানান:
খাবার অনিয়মিত, ওষুধ ভুল সময়ে, কাউন্সেলিং নেই, শুধু আচরণ সংশোধনের নামে হুমকি–ধমকি, রাতে আলো নিভে গেলে ভয়, চিৎকার আর আতঙ্কে ঘুমহীন সময়।
একজন প্রাক্তন রোগীর বর্ণনা—“ঘুমানোর জায়গা নেই, শান্তি নেই… মনে হতো এখানে সুস্থ হতে নয়, মারা যেতে এসেছি।”
পরিবার জিম্মি—‘কাস্টমার’ বানানোর চতুর ব্যবসা মডেল, পরিবার ভর্তি করানোর পরই শুরু হয় ভয়–ভিত্তিক ব্যবসা:
“৪/৬ মাসে হবে না—অন্তত ১ বছর রাখুন।” “রোগীর অবস্থা খুব খারাপ—দেড়–দুই বছর না থাকলে Relapse হবে।”
“ছুটি দিলে বিপদ আছে—সে আবার নেশায় যাবে!” অথচ এগুলোর বেশিরভাগই— রোগী ধরে রাখার ছদ্দবেশী শীতল বাণিজ্যিক কৌশল।
NA প্রোগ্রাম যেখানে স্বেচ্ছা অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দেয়—সেখানে রিহ্যাবগুলো ভয় দেখানোর মাধ্যমে “দীর্ঘমেয়াদি কাস্টমার” তৈরি করছে।
বিপরীতমুখী কাউন্সেলিং—রিহ্যাবের অদৃশ্য অমানবিক কৌশল।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে রিহ্যাব প্রতারণার সবচেয়ে ভয়ংকর অধ্যায়— ‘Contradictory Family Conditioning’
অর্থাৎ পরিবার ও রোগীকে আলাদা আলাদা ভিন্ন মিথ্যা গল্প শোনানো।
*পরিবারকে বলা হয়:
“ও খুব খারাপ অবস্থায়, ওর আচরণ বদলাতে হবে সে ক্ষেত্রে দীর্ঘ মেয়াদী ওকে রাখতে হবে অন্যথায় তাড়াতাড়ি বাসায় নিয়ে গেলে বড় ধরনের শারীরিক হামলা হতে পারে আপনাদের উপর “।
*রোগীকে বলা হয়: টেকনিক্যালি কমার্শিয়াল চিন্তাধারা থেকে এমন ভাবে কাউন্সিলিং দেওয়া হয় যার অর্থ দাঁড়ায় “তোমার পরিবার তোমাকে বোঝেই না … তারা তোমাকে দ্রুত বাসায় নিতে চাচ্ছে না দীর্ঘদিন রাখতে চায় রিহ্যাব সেন্টারে ! থাকতে থাকো আমাদের সাথে আমরাই তোমার আপন।” ফলে রোগীর মন থেকে পরিবারকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়, যাতে রোগী মানসিকভাবে সেন্টারের ওপর নির্ভরশীল থাকে।
এর ফল: বাড়ি ফিরে পরিবারকে সন্দেহ, তীব্র দ্বন্দ্ব, ভয় ও হতাশা এবং শেষমেশ Relapse।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা একবাক্যে বলছেন—“এটা চিকিৎসা নয়—পরিবার ভাঙার শিল্প।” NA (Narcotics Anonymous) দর্শনকে বিকৃত করে বেচা-বিক্রি !
NA প্রোগ্রাম কখনোই:
জোর করে ভর্তি, ৬–১২ মাসের বন্দিদশা, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা, ভয়–ভিত্তিক কাউন্সেলিং, এসব সমর্থন করে না।
কিন্তু রিহ্যাবগুলো ঠিক এগুলোকেই ব্যবসায়িক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।
একজন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট বলেন—“যেখানে মুক্তির কথা বলা উচিত, সেখানে ট্রমার জঞ্জাল তৈরি করা হচ্ছে।”
আর্লি রিকভারি রোগীদের ওপরও মানসিক দমন—সেন্টারনির্ভর জীবন তৈরি প্রোগ্রাম শেষে রোগী যখন নতুন জীবনে ফেরার চেষ্টা করে—তখনই শুরু হয় দ্বিতীয় দফা চাপ:
“এখনই ছাড়লে relapse হবে।”
“পরিবার তোমাকে সামলাতে পারবে না।”
“সেন্টারের সাপোর্ট ছাড়া তুমি বাঁচবে না।”
“আমাদের কাছেই থাকতে হবে।”
NA যেখানে রোগীকে স্বাধীন জীবনের দিকে এগোতে শেখায়—সেখানে রিহ্যাবগুলো তাদের “আজীবনের কাস্টমার” বানাতে চায়।
একজন রোগী বলেন—“ভয় দেখিয়ে আমাকে আবার ফিরে আসতে বাধ্য করা হয়েছিল।”
সমাজবিদদের মত—এটা শুধু অনিয়ম নয়, একটি ভয়ংকর সামাজিক প্রতারণা।
সমাজবিদরা বলছেন—পরিবার যখন মানসিকভাবে দুর্বল—রিহ্যাব ব্যবসায়ীরা তখনই আঘাত করে।
রোগী নয়—টাকার প্রবাহই তাদের লক্ষ্য সামাজিক লজ্জা ও অজ্ঞতাকে পুঁজি করে গড়ে উঠেছে এই বাজার।
একজন সমাজবিদের তীক্ষ্ণ মন্তব্য—“উন্নত দেশে রিহ্যাব মুক্তির জায়গা, আমাদের দেশে অনেক রিহ্যাব অন্ধকার ঘর।”
বাঁচতে গিয়ে মরছে মানুষ তাই সময় এসেছে এখনই কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
১) রিহ্যাব সেন্টারের উপর কঠোর লাইসেন্সিং ও মনিটরিং
২) অদক্ষ লোক দিয়ে কাউন্সেলিং—তা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ
৩) পরিবারকে ভয় দেখানো বা মিথ্যা তথ্য দিলে সঙ্গে সঙ্গে আইনি ব্যবস্থা
৪) NA মডেল অনুসরণ বাধ্যতামূলক—স্বেচ্ছা অংশগ্রহণ, গ্রুপ সেশন, পরিবারভিত্তিক Rehabilitiation কমিউনিটি সাপোর্ট।
এগুলো নিশ্চিতে ব্যর্থ হলে, রিহ্যাব সেন্টারগুলো আর মানুষকে বাঁচাবে না—বরং মানুষ বাঁচাতে গিয়ে মানুষই মরবে। আজ রিহ্যাব সেন্টারের অনিয়ম শুধু একটি সেক্টরের সমস্যা নয়— এটি মানবাধিকার, পরিবার, মানসিক স্বাস্থ্য ও সমাজের অস্তিত্বের হুমকি।
পুনর্বাসনের নামে যে “আশ্রয়” দেওয়া হয়— আজ তা হয়ে দাঁড়িয়েছে বন্দিদশা, অমানবিকতা ও ব্যবসায়িক প্রতারণার নির্মম কারখানা।
সময় এসেছে উচ্চারণ করার—“সুস্থতার নামে আর কোনো পরিবারকে নিঃস্ব হতে দেব না।”
Leave a Reply